মুম্বাইয়ে ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞাসা করে ‘কলমা’ পড়তে বলার পর ছুরিকাঘাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।
আর্ন্তজাতিক ডেস্ক,
মুম্বইয়ের মিরা রোড এলাকার নয়া নগরে সোমবার ভোর প্রায় চারটা নাগাদ একটি নির্মীয়মাণ ইমারতের গেটে ডিউটি দিতে গিয়ে দুই নিরাপত্তারক্ষীর জীবনটা হঠাৎ করেই ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে জড়িয়ে পড়ে। রাজকুমার মিশ্র ও সুব্রত সেন নামে দুই নিরাপত্তাকর্মীর উপর মাথা ঠান্ডা রেখে ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাইব জুবের আনসারি নামের এক ব্যক্তি, যার কারণ ছিল শুধু একটাই: তাঁরা কলমা পড়তে পারেননি। তদন্তকারীদের মতে, এই ঘটনা শুধু স্থানীয় ক্রাইম নয়, বরং সম্ভাব্য একটি ‘লোন–উল্ফ’ ধরনের ধর্মপ্রণোদিত হিংসার ইঙ্গিত হতে পারে, যেখানে কোনও সংগঠিত সন্ত্রাসী গ্রুপ না হয়েও একজন চরমপন্থাপ্রবণ ব্যক্তি নিজের আইডিওলজি ও অনলাইন প্রচারণা থেকে উৎসাহিত হয়ে হামলা চালাল।
সিসিটিভি ও পুলিশ সূত্রে যা জানা যাচ্ছে, জাইব জুবের আনসারি (৩১) প্রথমে পরিকল্পনা মতো নির্মীয়মাণ ভবনের গেটের কাছে এসে নিরাপত্তারক্ষী সুব্রত সেনের কাছে রাস্তা জিজ্ঞাসা করার ছুতোয় তাঁর নাম জানতে চাইলেন। তারপরই ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন শুরু হয়েছে, আর সেই ধারার শেষে এসেই তাঁকে ইসলামিক কলমা পড়তে বলা হয়। যখন সুব্রত নিজে বলেন যে তিনি কলমা পাঠ করতে পারেন না, তখনই আনসারি হঠাৎ পকেট থেকে ছুরি বের করে তাঁকে আক্রমণ করেন। এরপর তিনি সেই নিরাপত্তা সুপারভাইজার রাজকুমার মিশ্রের কাছে যান, তাঁর কাছেও কলমা পড়ার নির্দেশ দিতে যান; তিনি না পারার পর তাঁকেও ছুরি দিয়ে কোপ করেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে রাজকুমার মিশ্র গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, আর সুব্রত সেন হালকা থেকে মাঝারি চোট নিয়ে জীবন বাঁচাতে পারলেন, সেকেন্ডগুলোতেই নিরাপত্তাকক্ষের ভেতরে ঢুকে লুকিয়ে পড়েন।
মুম্বই পুলিশের তরফ থেকে বলা হচ্ছে যে অভিযুক্ত যুবক এই হামলা কোনও অভিযোগ বা আবেগ থেকে না হয়ে ধারালো চিন্তাভাবনা ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে লক্ষ্য ঠিক করে করেছেন। তাঁর কাছে কলমা না পাঠ করলে সেটাই তাঁদের “অন্য ধর্ম” বা “অন্য গোষ্ঠী” হিসেবে প্রমাণ করে দেয়, এবং সেই “প্রমাণের” পর ছুরি হাতে নিয়ে হামলা হয়ে যায়। এই ধরনের প্রশ্নোত্তর–পরবর্তী হিংসাকে তদন্তকারীরা স্পষ্টভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও চরমপন্থার প্রতীক হিসেবে দেখছেন, এবং এটিকে প্রথাগত লুটপাট বা পারিবারিক বিবাদ থেকে আলাদা রেখে এক স্তরে উপরে তুলে ধরছেন।
প্রাথমিক গ্রেফতারির পর পুলিশ জানিয়েছে যে জাইব জুবের আনসারি পেশায় বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন, আর তাঁর শিক্ষা জীবনের অংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সূত্রগুলো মোটামুটি সঙ্গতভাবেই বলছে যে তিনি অনলাইনে ইসলামিক স্টেট বা সদৃশ গ্রুপের প্রচারণামূলক ভিডিও, টেক্সট ও সোশ্যাল‑মিডিয়া কনটেন্ট দেখে এসেছেন, যা তাঁর মধ্যে ধর্মীয় কঠোরতা ও অন্য ধর্ম বা গোষ্ঠীকে “শত্রু” বা “অশুদ্ধ” হিসেবে ভাবতে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। এখনও পর্যন্ত কোনও সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ মেলেনি, তবে এই ধরনের আচরণ–প্যাটার্ন দেখে মহারাষ্ট্র অ্যান্টি‑টেররিজম স্কোয়াড (এটিএস) এটিকে সম্ভাব্য ‘লোন–উল্ফ’ হামলা হিসেবে মানছে, অর্থাৎ নিজস্ব চরমপন্থাপ্রবণতা থেকে এককভাবে সন্ত্রাসী কাজ করা, কিন্তু আইডিওলজির প্রভাব বাইরের প্রোপাগান্ডা থেকে আসতে পারে।
ঘটনার পর মিরা রোডে তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, সিম কার্ড, সোশ্যাল–মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস সিজ করে ডিজিটাল ফরেনসিক শুরু করা হয়েছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য এই যে কোনও স্থানীয় বা জাতীয় স্তরে আর কারও সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে কিনা, তাঁর মানসিকভাবে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো কোনও নেটওয়ার্ক কাজ করেছে কিনা, এবং এই ধরনের অনলাইন সংস্পর্শের প্রভাব আর কার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে তা বের করা। নিরাপত্তা সংস্থাগুলির বিশ্লেষণ হল, এখনকার যুগে সংগঠিত নিয়োগ ছাড়াই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ফোরাম, ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং চ্যানেল ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম কিছু মানুষের মধ্যে এমন চরমপন্থা ফুটিয়ে তুলতে পারে যে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে হামলা চালায়, কিন্তু বার্তা বহন করে সংগঠিত সন্ত্রাসী গ্রুপের আইডিওলজিকে।
এই ঘটনার কথা পুরো ভারতে ছড়াতেই অন্য কিছু সদৃশ ঘটনার কথাও মাথায় আসে, যেখানে কারও ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে পরেই হামলা হয়েছে। পহেলগাম বা সদৃশ কয়েকটি ঘটনায় প্রথমে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “তুমি হিন্দু/মুসলিম কি?”, তারপরই সেই উত্তর অনুযায়ী হিংসার নাটক শুরু হয়।



.png)

%20.png)

No comments: